নিজ সংস্কৃতিতে অনন্য সাঁওতাল

ছবি : প্লাবন আমিন

এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে বসন্তবরণ উৎসব ছিল বর্ণিল। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের নাচে-গানে, কবিতায় মুগ্ধতা ছড়ায় বকুলতলার মঞ্চ। এর মধ্যেই ঢোল, তর্কাল, বাঁশি ও নাগ্রা নিয়ে মঞ্চে উঠলেন একঝাঁক শিল্পী। তারা নিজেরাই গাইছেন, বাজাচ্ছেন, নাচছেন। তাদের সেই সুর-ছন্দ বসন্তের বাতাসের সঙ্গে দোলা দিয়ে গেল উপস্থিত দর্শকের অন্তরে। কারো দৃষ্টি পড়ছে না। কী সরল-সহজ সুরের টান তাদের সঙ্গিতে। তাহারিতা তানানানা তাহারিতাতা…।

নাচের ভঙ্গিমাও ভীষণ রকম সহজাত। মেয়েদের মাথায় কলসি আর তাতে রঙবেরঙের ফুল-পাতা। পরনে বাহারি পোশাক, গয়না। নজর কেড়েছে সবার।

হাত দিয়ে না ধরেই কলসি মাথায় নিয়ে আনন্দের সঙ্গে নেচে যাচ্ছিল তারা। কখনও বাঁশনৃত্য, কখনও লাঠিনৃত্য, কখনও কেবল মৃদঙ্গ, মন্দিরার তালে মাতিয়ে তোলা। … গাছের পাতার দোল-দোলুনির মতো নাচাটাও যেন খুব সহজ তাদের কাছে, খুব স্বাভাবিক। মুখজুড়ে মিষ্টি হাসি, সহজ কথার গাঁথুনিতে লোকগানের সঙ্গে এই নাচ মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিল মাটির ঘ্রাণ। তাদের মারফরম্যান্স শেষ হতেই শত শত দর্শক দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাল। শেষ হয়েও যেন হলো না শেষ। করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল বকুলতলার চারপাশ।

শিল্পীদের এই দলটা এসেছিল উত্তরবঙ্গ থেকে। তারা সবাই নওগাঁর নিয়ামতপুরের সাঁওতাল, উড়াও সম্প্রদায়ের বাসিন্দা। বসন্ত উৎসবকে তারা বলে ‘বাহা’ উৎসব। এটাই তাদের অন্যতম প্রধান উৎসব।

এ বিষয়ে নৃত্যশিল্পী সন্তেস হাসদা বলেন, ‘বাহা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ফুল। সেজন্যই এ উৎসবকে ফুল বা বসন্ত উৎসব বলা হয়। শাল-পলাশ ফুটতে শুরু করা মানেই বাহার আগমনী বার্তা। ঝরা পাতার মর্মর ছাপিয়ে নতুন ফুল পাতায় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে চারিধার।

প্রকৃতি পূজারি আদিবাসীদের মধ্যে তখন আনন্দের বান ডেকে যায়। সাঁওতালদের গ্রামে গ্রামে তখন ধুম পড়ে যায় বাহা উৎসবের। তরুণ-তরুণীরা যেন উৎসবের প্রাণ। ফুলের আভায় রঙিন হয়ে সেজে ওঠে তারা।

নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, সাজসজ্জা আর শিল্প-সংস্কৃতির মিশ্রণেই ছিল এই পরিবেশনা। সাঁওতাল আদিবাসীদের শিল্প বিকাশে কাজ করছে ত্রিশূল সমাজ কল্যাণ সংস্থা। নৃত্য পরিচালনা ও ভাবনায় ছিলেন প্রকৌশলী ও নৃত্যশিল্পী তৃণা মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সাঁওতাল ও উড়াও নৃত্য ও বাদ্য এখন হারাতে বসেছে। এরা যা শিখেছে তা তাদের বাবা-মার থেকে শিখেছে। যেহেতু আমিও একজন নৃত্যশিল্পী, তাই মনে হয়েছে, আমি যদি তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে আসি। সেজন্যই এই পরিবেশনা।’ সংস্থাটি শিল্পচর্চার সঙ্গে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সামাজিক উন্নয়ন নিয়েও কাজ করছে।

রাজধানীর দর্শকের সামনে নিজেদের শিল্প-সংস্কৃতি তুলে ধরতে পেরে তৃপ্তি পেয়েছেন শিল্পীরাও। নৃত্যশিল্পী ঋতু মুরমু বলেন, কোনো জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিই যেন হারিয়ে না যায়। রঙ্গে ভরা এই বঙ্গে টিকে থাক সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। তবেই সমৃদ্ধ হবে গোটা দেশের সংস্কৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these